নিজস্ব প্রতিবেদক জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, বিদেশগামী শ্রমিকদের হয়রানি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে নানা কৌশলে সরকারী টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী সরকারের সময়ে সহকর্মীদের ল্যাং করে পরিচালক পদ বাগিয়ে কিভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছেন তা নিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যই গুজ্ঞন চলছে এটা কিভাবে সম্ভব? এসব অজানা তথ্য জানতে ভহক্তভোগীরা পরিচালক মাসুদ রানার অবৈধ টাকা কামাইয়ের রহস্য জানতে প্রশাসনের কাছে দিচ্ছেন একের পর এক অভিযোগ। সর্বশেষ গত ১২ মে জনপ্রশাসন ও প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের সচিবের কাছে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। ওই লিখিত অভিযোগটি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ মো. মন্টু মিয়া নামের ব্যক্তি । তিনি তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, মো. মাসুদ রানা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে নানা কৌশলে ফাইল আটকিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। যদিও তিনি প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগকারীর দাবি, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিদেশগামী কর্মীদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে হয়রানি করে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। একই সাথে সারাদেশে যত টিটিসি রয়েছে সেগুলোর অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকায় তলব করে তার রুমে ডেকে এনে বৈঠক করেন। এরপর তাদেরকে ইচ্ছামতো বদলী করেন। এসব বৈঠকের বেশীরভাগ সময় তার রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকে। খোজ নিয়ে ও অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-এর পরিচালক মো. মাসুদ রানা নেত্রকোনা জেলার মহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামের মোহাম্মদ মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তার জাতীয় পরিচয় পত্র নং ৭৩৪১ ৬৫৫১৯৪ টিআইএন নং-৬৫৫১৫০৪৫৬৮১৯, কর সার্কেল-৮৮, কর অঞ্চল-০৪, ঢাকা। বর্তমান বাসার ঠিকানা: বাসা-৬৫/৩, পশ্চিম আগারগাও। তার স্ত্রী উম্মে ছালমা শেখ। তার পিতার নাম-আফতাব উদ্দিন শেখ। তার জাতীয় পরিচয় পত্র নং ৭৭৮৯ ৮২ ১১ ০০ , টিআইএন নং-৪২০৫৭১৭৯১৪১৯, কর সার্কেল-২০৭, কর অঞ্চল-১০, ঢাকা, ঠিকানা. একই। মোহাম্মদ ঝন্টু মিয়ার ছেলে অভিযোগকারী মো. মন্টু মিয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পুনরায় কর্মস্থলে বহাল আছেন। বিগত সরকারের আমলে ফ্যাসিষ্ট মন্ত্রী ,এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের সহযোগিতায় একের পর এক ঘুষ- দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম চালিয়েছেন। যা এখনো চলছে। সবাই তাকে বিএমইটিতে অঘোষিত’ ডিজি’ হিসাবে মনে করেন। নতুন ডিজি যিনি আসেন তাকেই তিনি তার মতো করে পরিচালনা করেন। আর এসবই তিনি অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করেন থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসুদ রানার অবৈধভাবে গড়া বিত্ত বৈভবের বিষয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তার এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া উত্তরা এলাকায় দুটি বাড়ি, সাভারে প্রায় কয়েক বিঘা জমি এবং গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় বিলাসবহুল বাড়ি, জমি থাকার তথ্য রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। মো. মাসুদ রানা মালয়েশিয়াতে মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড রয়েছে। শুধু তাই নয় দুবাইতে জনৈক রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিকের সাথে জনশক্তি ব্যবসা রয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে ভিলা ও গোল্ড ব্যবসা রয়েছে বলে নানা সুত্র থেকে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। তার বিরুদ্ধে সঠিকভাবে তদন্ত শুরু হলে তার অবৈধ অঢেল সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির আরও বিস্তর তথ্য বেরিয়ে আসবে। তিনি সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এখন ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে আজ পরিচালক মো. মাসুদ রানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি প্রতিবারই ফোন কেটে দিচ্ছেন। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি। মন্ত্রনালয়ে দেয়া অভিযোগকারীর দাবি সুষ্ঠ তদন্ত করা হলে মাসুদ রানা যে ৪ থেকে ৫
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মনোনীত করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য মনোনীত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি হল : ১. বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড ২. বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ৩. জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি ৪. মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস ৫. আনেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল ৬. আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড ৭. আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ৮. খান জাহান আলী ওভারসিজ ৯. মেসার্স আল-শুক্তো ওভারসিজ ১০. মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড ১১. রিফা ইন্টারন্যাশনাল ১২. ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১৩. এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল ১৪. আল-হায়াত ওভারসিজ ১৫. ভালুকা ওভারসিজ ১৬. ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কনট্রাক্টিং লিমিটেড ১৭. চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল ১৮. কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি ১৯. গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড ২০. জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ ২১. মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল ২২. ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিংক ২৩. নেবার অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ২৪. তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ২৫. দ্য অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ার মধ্যেই এ তালিকা সামনে এল।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের প্রকৃত পরিচয় কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কী প্রকৌশলী না-কি প্রকৌশলীর নামধারী ঠিকাদার-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো অধিদপ্তর জুড়ে। এমন অনৈতিক একজন প্রকৌশলী আগামী ডিসেম্বরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম শাখার সর্বোচ্চ পদধারী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হতে যাচ্ছেন। যিনি প্রায় আট বছর এ দায়িত্বে থাকবেন। ঢাকা রাজধানীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল–মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–৪–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থেকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে তার আপন ছোট ভাইয়ের সম্পৃক্ততার দাবিও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই/এম সার্কেল–৪–এর অধীনে পরিচালিত অধিকাংশ বড় প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে পেয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী তৈমুর আলম তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে সাজাতেন যাতে তার পছন্দের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন বলে দপ্তরের ভেতরেই গুঞ্জন রয়েছে। তৈমুর আলমের দুর্নীতির বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে তার পরিবারের সদস্যদের নাম। বিশেষ করে তার ছোট ভাই অংকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, ভাইয়ের প্রশাসনিক পদমর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন। অনেক ক্ষেত্রে অংকুরই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর মধ্যে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে কাজ করতেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। সরকারি বদলি নীতিকে তোয়াক্কা না করে তৈমুর আলম ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বছরের পর বছর একই এলাকায় দায়িত্বে থাকায় তিনি একটি দুর্ভেদ্য প্রভাব বলয় তৈরি করেছেন, যা তাকে অনিয়ম চালিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তৈমুর আলমের বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনিক অভিযোগই নয়, বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, ঢাকার একটি আদালতে (সিআর মামলা নং–১১৮/২০২৫) সরকারি তহবিল তছরুপ, প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মো. তৈমুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং প্রশাসনিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, কোনো অভিযোগই এখন পর্যন্ত বিচারিক বা দাপ্তরিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরে বর্তমান ১৫তম বিবিএস-এর প্রকৌশলীরা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই অবসরে যাবেন। সে কারনে আগামী ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হবেন। এমন একজন অনৈতিক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে একটি পদে থাকবেন যা খুবই বেমানান। তিনি হয়তো তার প্রভাব খাটিয়ে পুরো প্রকৌশল সিস্টেমকে ব্যাবসায় পরিণত করে ফেলবেন। পদোন্নতির আগে তাঁর এসব বিষয়ে নিবিড় অনুসন্ধান হওয়া উচিত এবং কর্তৃপক্ষের উচিত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে একদিকে যেমন প্রথম স্ত্রীর পারিবারিক অবহেলা, দ্বিতীয় বিয়ে ও একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধানের আবেদনের মাধ্যমে উত্থাপিত হয়েছে। বদরুল আলম খানের প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিন অভিযোগ করেন, ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি স্বামীর কাছ থেকে চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের সংসারে তিন কন্যা সন্তান রয়েছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সংসারজীবনে বদরুল আলম খান পরিবারের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। বাবার এমন আচরণের কারণে তাঁদের ছোট মেয়ে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মিসেস জেসমিনের নামে ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ডিসচার্জ সার্টিফিকেট প্রকাশ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, তিনি ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান। প্রতিবেদনের দাবিতে বলা হয়, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তিনি স্বামীর অপেক্ষায় ছিলেন, অথচ বদরুল আলম খান অন্যত্র অবস্থান করছিলেন। একই প্রতিবেদনে বদরুল আলম খানের দ্বিতীয় বিয়ে এবং অন্য এক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগও তোলা হয়েছে। বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা করে তিনি অন্য এক নারীর সঙ্গে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। এছাড়া তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য নথিপত্র থাকার দাবিও করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি দায়িত্ব পালনেও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে পরিবর্তনের পর বদরুল আলম খানের প্রশাসনিক প্রভাব আরও বেড়ে যায়। কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং ভোলায় কর্মরত অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে টেন্ডার, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার কয়েকজন ঠিকাদারকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। কুমিল্লার একটি দরপত্রে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ এবং “আসিফ” নামের এক ঠিকাদারকে পুলিশের বিভিন্ন থানা ভবন নির্মাণসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য বিভাগের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানার ভবন নির্মাণের কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বদরুল আলম খান, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, খামারবাড়ি, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভাই-বোনদের নামে সম্পদ স্থানান্তর, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও তদন্তের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য এবং বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে গত কয়েক মাসে প্রায় ১২২ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করা হয়েছে। এই অর্থ নিজের নামে না রেখে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে স্থানান্তর ও গোপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বদলি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ ফেব্রুয়ারি সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ সার্কেলে বদলির ক্ষেত্রে অন্য কর্মকর্তার নাম সুপারিশ থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে নিজের পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করেন তিনি। বদলির পরও অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অতীতে ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল। এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য গণপূর্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি বিধায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, বিদেশগামী শ্রমিকদের হয়রানি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে নানা কৌশলে সরকারী টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী সরকারের সময়ে সহকর্মীদের ল্যাং করে পরিচালক পদ বাগিয়ে কিভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছেন তা নিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যই গুজ্ঞন চলছে এটা কিভাবে সম্ভব? এসব অজানা তথ্য জানতে ভহক্তভোগীরা পরিচালক মাসুদ রানার অবৈধ টাকা কামাইয়ের রহস্য জানতে প্রশাসনের কাছে দিচ্ছেন একের পর এক অভিযোগ। সর্বশেষ গত ১২ মে জনপ্রশাসন ও প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের সচিবের কাছে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। ওই লিখিত অভিযোগটি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ মো. মন্টু মিয়া নামের ব্যক্তি । তিনি তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, মো. মাসুদ রানা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে নানা কৌশলে ফাইল আটকিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। যদিও তিনি প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগকারীর দাবি, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিদেশগামী কর্মীদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে হয়রানি করে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। একই সাথে সারাদেশে যত টিটিসি রয়েছে সেগুলোর অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকায় তলব করে তার রুমে ডেকে এনে বৈঠক করেন। এরপর তাদেরকে ইচ্ছামতো বদলী করেন। এসব বৈঠকের বেশীরভাগ সময় তার রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকে। খোজ নিয়ে ও অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-এর পরিচালক মো. মাসুদ রানা নেত্রকোনা জেলার মহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামের মোহাম্মদ মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তার জাতীয় পরিচয় পত্র নং ৭৩৪১ ৬৫৫১৯৪ টিআইএন নং-৬৫৫১৫০৪৫৬৮১৯, কর সার্কেল-৮৮, কর অঞ্চল-০৪, ঢাকা। বর্তমান বাসার ঠিকানা: বাসা-৬৫/৩, পশ্চিম আগারগাও। তার স্ত্রী উম্মে ছালমা শেখ। তার পিতার নাম-আফতাব উদ্দিন শেখ। তার জাতীয় পরিচয় পত্র নং ৭৭৮৯ ৮২ ১১ ০০ , টিআইএন নং-৪২০৫৭১৭৯১৪১৯, কর সার্কেল-২০৭, কর অঞ্চল-১০, ঢাকা, ঠিকানা. একই। মোহাম্মদ ঝন্টু মিয়ার ছেলে অভিযোগকারী মো. মন্টু মিয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পুনরায় কর্মস্থলে বহাল আছেন। বিগত সরকারের আমলে ফ্যাসিষ্ট মন্ত্রী ,এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের সহযোগিতায় একের পর এক ঘুষ- দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম চালিয়েছেন। যা এখনো চলছে। সবাই তাকে বিএমইটিতে অঘোষিত’ ডিজি’ হিসাবে মনে করেন। নতুন ডিজি যিনি আসেন তাকেই তিনি তার মতো করে পরিচালনা করেন। আর এসবই তিনি অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করেন থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসুদ রানার অবৈধভাবে গড়া বিত্ত বৈভবের বিষয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তার এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া উত্তরা এলাকায় দুটি বাড়ি, সাভারে প্রায় কয়েক বিঘা জমি এবং গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় বিলাসবহুল বাড়ি, জমি থাকার তথ্য রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। মো. মাসুদ রানা মালয়েশিয়াতে মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড রয়েছে। শুধু তাই নয় দুবাইতে জনৈক রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিকের সাথে জনশক্তি ব্যবসা রয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে ভিলা ও গোল্ড ব্যবসা রয়েছে বলে নানা সুত্র থেকে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। তার বিরুদ্ধে সঠিকভাবে তদন্ত শুরু হলে তার অবৈধ অঢেল সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির আরও বিস্তর তথ্য বেরিয়ে আসবে। তিনি সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এখন ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে আজ পরিচালক মো. মাসুদ রানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি প্রতিবারই ফোন কেটে দিচ্ছেন। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি। মন্ত্রনালয়ে দেয়া অভিযোগকারীর দাবি সুষ্ঠ তদন্ত করা হলে মাসুদ রানা যে ৪ থেকে ৫
নিজস্ব প্রতিবেদক গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লটারি শুরুর আগেই ঢাকা জেলার বক্সে ৪১ জন প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম ও বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম নির্দিষ্ট বক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংস্থাপন শাখার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের পছন্দের কর্মকর্তাদের ঢাকা মেট্রো এলাকার বক্সে রাখার মাধ্যমে লটারির ফলাফলকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে গণপূর্তের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়ন নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মেহবুবুর রহমান: তার নিজ জেলা ঢাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, রমনা-১ থেকে আজিমপুর-পিলখানায় পদায়ন করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—নিজ জেলা ঢাকা এবং বর্তমান কর্মস্থলও ঢাকার মধ্যে থাকার পর আবার ঢাকাতেই পদায়নের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? সৌরভ রায়: তার নিজ জেলা ময়মনসিংহ। অভিযোগ রয়েছে, শেরে বাংলা নগর মেডিকেল থেকে তাকে সাভারে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ তার লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগেই তার নাম ঢাকা মেট্রোজোনের বক্সে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। আসাদুজ্জামান সাদ: তার নিজ জেলা টাঙ্গাইল। অভিযোগ অনুযায়ী, হাইকোর্ট সাব-ডিভিশন থেকে তেজগাঁও সাব-ডিভিশনে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত থাকার পরও কেন তাকে ঢাকার বাইরে লটারির আওতায় নেওয়া হয়নি? এ এস এম সাখাওয়াত ইসলাম (সোহেল): তার নিজ জেলা বগুড়া। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এর আগে ঢাকা ডিভিশন-৪ ও শেরে বাংলা নগর এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে গাজীপুর থেকে মিরপুরে পদায়নের তথ্য সামনে এসেছে। এ নিয়েও লটারির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। রেজাউল করিম মিঠু: তার নিজ জেলা ফরিদপুর। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তিনি শেরে বাংলা নগর ও মহাখালীতে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মতিঝিল থেকে গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন। এজাজ আহমেদ খান: তার নিজ জেলা নেত্রকোনা। অভিযোগ রয়েছে, তার লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকা মেট্রোজোনের বক্সে স্থানান্তর করা হয়। পরে শেরে বাংলা নগর উপবিভাগ-৮ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়নের তথ্য সামনে এসেছে। আসরাফুল আউয়াল রানা: তার নিজ জেলা জামালপুর। অভিযোগ অনুযায়ী, তারও ময়মনসিংহ বিভাগে লটারির আওতায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু লটারির আগেই ঢাকা মেট্রোজোনের বক্সে নাম স্থানান্তর করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। পরে সাভার থেকে মতিঝিলে পদায়ন করা হয়েছে। আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে ৫৫ ও ৬০ নম্বর নিয়ে অভিযোগকারীদের দাবি, তালিকার ৫৫ ও ৬০ নম্বর ক্রমিকের কয়েকজন কর্মকর্তার নিজ জেলায় নাম ওঠার পরও তাদের সেখানে পদায়ন করা হয়নি। বরং নাম কেটে পাশের জেলায় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, যেসব কর্মকর্তার নিজ জেলা ও বর্তমান কর্মস্থল-দুটিই ঢাকা, তাদের আবারও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এ অবস্থায় প্রকৌশলীদের প্রশ্ন-যদি লটারিই বদলি ও পদায়নের মূল ভিত্তি হয়, তাহলে লটারির আগে কোনো কর্মকর্তার নাম নির্দিষ্ট বক্সে স্থানান্তরের সুযোগ কেন থাকবে? স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন গণপূর্ত অধিদপ্তরের লটারিভিত্তিক বদলির অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও বদলি বাণিজ্য বন্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু লটারির আগেই যদি কোনো কর্মকর্তার নাম নির্দিষ্ট এলাকার বক্সে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অভিযোগকারীরা বলছেন, লটারির আগে কোন কর্মকর্তা কোন বক্সে ছিলেন, কার নাম কখন স্থানান্তর করা হয়েছে এবং সেই পরিবর্তনের অনুমোদন কে দিয়েছেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। তাদের দাবি, লটারির মূল তালিকা, বক্সভিত্তিক কর্মকর্তাদের তালিকা এবং লটারির আগে-পরে করা পরিবর্তনের রেকর্ড প্রকাশ করা হোক। এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন লটারির আগে কি সত্যিই ৪১ জনের নাম ঢাকা জেলার বক্সে স্থানান্তর করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, কোন নীতিমালার অধীনে এবং কার অনুমোদনে এই পরিবর্তন করা হয়েছিল? নিজ জেলা বা নিজ বিভাগের বাইরে থাকার কথা থাকলেও কিছু কর্মকর্তাকে কেন ঢাকা মেট্রোর আওতায় রাখা হলো? আর নিজ জেলায় নাম ওঠার পরও কেন কিছু কর্মকর্তাকে অন্য জেলায় পদায়ন করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেই বোঝা যাবে- গণপূর্তের লটারি ব্যবস্থা সত্যিই পুরোপুরি স্বচ্ছ ছিল, নাকি লটারির আগেই তৈরি হয়েছিল পছন্দের কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা হিসাব।
পুরান ঢাকার সদরঘাটে চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে মিতুল নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। শনিবার রাত ১১টার দিকে সূত্রাপুর থানার ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মিতুল কোতোয়ালি থানার ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য বলে জানা গেছে। তিনি ঝালকাঠির সাহাবাঙ্গল গ্রামের মো. রাসেল সরদারের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাবেক যুবদল নেতা সোবহান ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক কিরণ—দুজনই মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মো. সুমন ভূঁইয়ার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দুজনই কোতোয়ালি থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। শনিবার রাতে চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, সংঘর্ষে কিরণ গ্রুপের এক সদস্য নিহত হয়েছেন। কাপড় কাটার কাচি দিয়ে বুকে আঘাতের পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে নিহত মিতুলের স্বজনসহ প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন মিটফোর্ড হাসপাতালে অবস্থান করছেন। সেখানে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সুমন ভূঁইয়া বলেন, ‘এরা আমার সমর্থক নয়। তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে থাকে। আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। বিস্তারিত জানতে পারিনি।’ সূত্রাপুর থানার ওসি মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘নিহত মিতুল কোন দলের সঙ্গে যুক্ত, তা পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পূর্বশত্রুতার জেরে কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে আঘাতের ঘটনায় মিতুলের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’ ওসি আরও বলেন, ‘ময়নাতদন্তের জন্য মিতুলের মরদেহ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।’
নাম কেএএম মাজেদুর রহমান। যিনি ৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন মালদ্বীপের একটি ব্যাংকে। তাও আবার চেয়ারম্যান পদে। এর আগে বাংলাদেশে ছিলেন প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ফলে তার জীবন তো বর্ণাঢ্য বটে। কিন্তু না। খুবই ধূর্ত প্রকৃতির মাজেদুর প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সিন্ডিকেটে থাকা ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালত ইতোমধ্যে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে অর্থ লুটপাটের তথ্য-উপাত্ত মিলেছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে পরবর্তী ধাপে আরও বাড়তে পারে। এদিকে বিদেশে ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই কাটছিল তার সময়। কিন্তু বিধিবাম। মাজেদুর দেশে এসে পান দুসংবাদ। অতঃপর তিনি নানা অজুহাতে দেশ ছাড়তে মরিয়া। তবে দুদকের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও কঠোর অবস্থানের কারণে আদালত তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক খাতে লুটপাটে জড়িত থেকে পার পেয়ে যাওয়ার কৌশল ভালোই রপ্ত করেছিলেন সুচতুর মাজেদুর রহমান। দেশে দুর্নীতির পাঠ চুকিয়ে এবার বিদেশে গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাবেন, এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই হিসাব মেলেনি। দুদকের অনুসন্ধানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য ও রেকর্ডপত্র সামনে আসায় বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ও এখন অনিশ্চিত তার জন্য। আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বারবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি তিনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে একজনের পর একজন অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে গিয়ে বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগ পাবেন। মাজেদুর রহমানের ক্ষেত্রেও এখন অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুদক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের বিভিন্ন অর্থ আত্মসাতের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে অনুসন্ধান দল। দুদক সূত্র জানায়, এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের সঙ্গে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তৎকালীন ব্যাংকের বোর্ডও এসব অনিয়মের বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিল। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে নির্বাহী পর্ষদের সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর। ফলে ব্যাংকের চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল। অনুসন্ধানকারী দল প্রতিটি আর্থিক অনিয়ম ও লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম। রেকর্ডপত্রে যাদের নাম, বোর্ডে যাদের উপস্থিতি এবং যাদের অনুমোদন পাওয়া যাবে, পর্যায়ক্রমে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। দুদক সূত্র আরও জানায়, মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এর আগে কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একাধিকবার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য চাওয়া হলে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততা ও তার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। দুদক সূত্রের দাবি, প্রিমিয়ার ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ইতোমধ্যে প্রায় ১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়েছে। কমিশন কার্যকর থাকলে অনুসন্ধান থেকে মামলার সংখ্যা আরও বাড়ত। ২৮ হাজার কোটি টাকা লুটের অনুসন্ধান : প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা অনুসন্ধানের অংশ হিসাবেই মাজেদুরের নাম এসেছে। দুদকের নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ইকবাল সেন্টারসহ বিভিন্ন শাখার অফিস ভাড়া বাবদ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে লুটপাট ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন স্টেশনারি খাতে ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর তথ্যপ্রমাণও পেয়েছে দুদক। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এফডিআর খুলে অবৈধভাবে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়ার মাধ্যমে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট এবং বিপিএল ও টেলিভিশনে ভুয়া প্রচার দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে। বিদেশ যেতে মরিয়া : ২০২৫ সালের নভেম্বরে মাজেদুর রহমানসহ ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। এরপর থেকেই বিদেশে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে আদালতের অনুমতি চেয়ে আসছেন মাজেদুর। দুদকের আশঙ্কা, তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হলে চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে আদালতে অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি। মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের স্পষ্ট দুটি অনিয়মের নথিতে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের ৯০১ নম্বর সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সভার সদস্য সচিব ছিলেন তৎকালীন এমডি মাজেদুর রহমান। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, ৮৫ হাজারের জায়গায় তৈরি করা হয় মাত্র ২৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয় মাত্র ৬৫ লাখ টাকা। দুদকের হিসাবে, কার্যাদেশের ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ৬৫ লাখ টাকা বাদ দিলে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এরপর একই ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তখনও নির্বাহী পর্ষদের সভার সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর রহমান। কিন্তু সরবরাহ করা হয় মাত্র ৯০ হাজার ক্যালেন্ডার। এজন্য ভেন্ডরকে পরিশোধ করা হয় ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বাকি ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুই কার্যাদেশে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে দুদক। বিএফআইইউর তালিকায় ৭ নম্বরে মাজেদুল : ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বিএফআইইউ প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, তছরুপ, ঋণ জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয়। দুদকের নথি অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তালিকায় ৭ নম্বরে রয়েছে কেএএম মাজেদুর রহমানের নাম। তাকে অন্যতম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বনানীর ইকবাল সেন্টার সিলগালা : এদিকে রাজধানীর বনানীতে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন ‘ইকবাল সেন্টার’ সিলগালা করেছে দুদক। এ ভবনেই ২৬ বছর ধরে প্রধান কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেছে ব্যাংকটি। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওই ভবনে অভিযান চালায় দুদক। পরে তল্লাশি শেষে তার চেম্বারসহ সেন্টার সিলগালা করে দেওয়া হয়। দুদক সূত্র জানায়, তল্লাশিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া না গেলেও বিপুল পরিমাণ নথি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি অনুসন্ধান ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তল্লাশি ও জব্দের বিষয়ে কমিশনে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে আরও প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে। দুদক সূত্র জানায়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানটি বড় পরিসরে চলছে। একাধিক আর্থিক অনিয়মের পৃথক পৃথক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেসব অনিয়মে যার সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, অনুসন্ধানের পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বক্তব্য : কেএএম মাজেদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘অফিশিয়ালি আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। পত্রপত্রিকায় যতটুকু দেখেছি ততটুকুই জানি। ক্যালেন্ডার ও টিভি বিজ্ঞাপনের বিষয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ভেন্ডর যদি আলাদাভাবে কোনো অনিয়ম করে থাকে, সেটা তার বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমাকে বোর্ডের সদস্য সচিব বলা হচ্ছে, সেটাও ভুল। ব্যাংকে সদস্য সচিব বলে কোনো পদ নেই। কোম্পানি সেক্রেটারি শুধু রেকর্ড সংরক্ষণ করেন। আর এমডি পদাধিকার বলে বোর্ডের সদস্য হলেও তার ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো প্রমাণ থাকলে তা দেখানো উচিত। দুদকের যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে, সেটি আসলে থার্ড পার্টির অডিট রিপোর্ট। দুদক এখনো কোনো তদন্ত করেনি।’
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর ও শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত মোস্তফা কামাল শাহিনের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের হত্যা মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এত গুরুতর অভিযোগের পরও তিনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে বহাল তবিয়তে কর্মরত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার পর জাগৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার দুই মাসেরও বেশি সময় পর গত ২৮ জানুয়ারি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ জারি করা হয়। ফলে তদন্ত কমিটি গঠনেই যদি এতটা সময়ক্ষেপণ হয়, তাহলে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ হবে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সুবিধাভোগীরা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নানা কৌশল ও চালাকির আশ্রয় নেন মন্ত্রীর এলাকার পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অভিযোগকারীদের দাবি, মোস্তফা কামাল শাহিন অত্যন্ত কৌশলীভাবে নিজের প্রভাব বলয় তৈরি করে চলেছেন। তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর নিজ জেলা কুমিল্লার বরুড়া এলাকার বাসিন্দা—এই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের কাছে তিনি নিজেকে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিভিন্ন সময় সময় তিনি অনেক কে বলেন মন্ত্রী আমাকে কাজ করতে বলেছেন’—এমন বক্তব্য দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মন্ত্রীর এলাকার বাসিন্দা ও পরিচিতজন হওয়ার বিষয়টিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন। ফলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই তার বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলতে বা অভিযোগ করতে দ্বিধাবোধ করেন বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, একের পর এক দুর্নীতি আর জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহিন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে অনেক তথ্যের খোঁজও মিলেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে শাহিন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক। অথচ তিন বছরেও সে মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। দেয়া হয়নি অভিযোগপত্র। প্লট জালিয়াতি কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জাল স্বাক্ষরসহ বহু অপকর্মে হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন। তবে ক্ষমতার দাপটে বারবার তিনি ধরাছোয়ার বাইরে থেকেছেন। তার নিয়োগেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। সবচে বড় কথা, মোস্তফা কামাল শাহিন ছিলেন পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী। নিজেকে বড় আওয়ামী লীগার পরিচয় দিয়েই ১৬ বছর ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়েছেন। স্বঘোষিত সিবিএ নেতা বনে দেখিয়েছেন ক্ষমতার দাপট। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও তার ক্ষমতায় হেরফের হয়নি। বরং কালো টাকার জোরে ঊর্ধ্বতনদের বশ করে বহাল তবিয়তে আছেন। আর এ অভিযোগ যে কোনো অতিরঞ্জিত নয়, সাম্প্রতিক ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। মোস্তফা কামাল শাহিনের বিভিন্ন অপকর্ম নিয়ে গত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে অনেক গুলো জাতীয় পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয় হয়। তবে এর আগেই মন্ত্রণালয়ে তার দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এ প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে তার দুর্নীতি অনুসন্ধানের নির্দেশনা পেয়ে তদন্ত কমিটি করে জাগৃক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) যেন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্তদের জন্য ‘সেইফ জোনে’ পরিণত হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক দুর্নীতি, জালিয়াতি, নথি গায়েব ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে এলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকে লিখিতভাবে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরও তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জাগৃকের ভূমি শাখায় কর্মরত অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহিনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, প্লট জালিয়াতি, নথি গায়েব, ফাইল আটকে রেখে হয়রানি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভূমি শাখায় প্রভাব বিস্তার করে শাহিন বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ও অনুসন্ধানের বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মোস্তফা কামাল শাহিন ও তার স্ত্রী নাছরিন সুলতানার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকে মামলা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে চললেও এখনো কার্যকর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। প্লট ও নথি জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ শাহিনের বিরুদ্ধে ভূমি শাখার বিভিন্ন নথি নিয়ে গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু নথি অফিসের রেকর্ডের বাইরে থেকে তৈরি করে মূল নথি হিসেবে উপস্থাপন, ডিজিটাল নম্বর ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল এবং এসব নথির ভিত্তিতে লিজ দলিল সম্পাদনের মতো ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে মিরপুর হাউজিং এস্টেটের একটি বাড়ি ও কয়েকটি পুনর্বাসন প্লটের নথি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব নথির রেকর্ডরুমের তালিকা, নথি মুভমেন্ট রেজিস্টার, ডিজিটাল নম্বর, বরাদ্দপত্র, ব্যাংক চালান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে লিজ দলিল সম্পাদনের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, চালান ও সংশ্লিষ্ট নথির বৈধতা যাচাই করা হয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ মোস্তফা কামাল শাহিন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বিদেশে সম্পদ ও অর্থ স্থানান্তরের কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, তার চাকরিতে যোগদানের সময়কার সম্পদের বিবরণ এবং বর্তমানে অর্জিত সম্পদের তুলনামূলক হিসাব করলে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যেতে পারে। এ কারণে তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের বৈধ উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। সিবিএ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মোস্তফা কামাল শাহিন কর্মচারী ইউনিয়ন বা সিবিএর পদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ভূমি শাখার বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন। তবে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও সিবিএ-সংক্রান্ত এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত কমিটি শাহিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ১৭ নভেম্বরের চিঠির সূত্র উল্লেখ করে পরবর্তীতে জাগৃক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আহসান হাবিবকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় উপ-পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-২) তায়েব-উর রহমান আশিক এবং সহকারী পরিচালক (অর্থ) মো. আরিফুজ্জামানকে। অফিস আদেশে শাহিন, তার স্ত্রী এবং কথিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, ফাইল গায়েব, ফাইল আটকে হয়রানি, ডিজিটাল নম্বরবিহীন কাগজপত্র ব্যবহার করে লিজ দলিল রেজিস্ট্রেশন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের কথা বলা হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নেই প্রতিবেদন অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত ১৫ কার্যদিবস পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আহসান হাবিবকে অন্যত্র বদলি করা হয় বলে জানা গেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—আহ্বায়ক বদলি হওয়ার পর তদন্ত কমিটির কার্যক্রম কী অবস্থায় রয়েছে এবং কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে কি না। কমিটির সদস্য তায়েব-উর রহমান আশিক ও মো. আরিফুজ্জামানের কাছেও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক (অর্থ) মো. আরিফুজ্জামান কমিটি গঠনের বিষয়টি মৌখিকভাবে জানলেও লিখিত চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন—এমন দাবি করা হয়েছে অভিযোগে। বিষয়টি সত্য হলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। তদন্ত ধামাচাপার’ অভিযোগ অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কমিটি গঠনের পর জাগৃকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোস্তফা কামাল শাহিনের যোগাযোগ ও যাতায়াত বেড়ে যায়। এরপরই তদন্ত কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে। তদন্ত ধামাচাপা বা প্রভাবিত করার এই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ অবশ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণে তদন্ত কমিটির কার্যবিবরণী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অফিস নথি এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগপত্রে শাহিনের নিয়োগ ও পরবর্তী পদ পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত নথি, নিয়োগের সময়কার বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদায়ন ও পদ পরিবর্তনের আদেশ যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীরা মনে করেন, ব্যক্তিগত নথি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত মূল কাগজপত্র পরীক্ষা করলেই এসব অভিযোগের সত্যতা সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ শাহিনের কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জাগৃকের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নথি উপস্থাপন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, ঘুষ লেনদেন ও বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সরকারি তদন্তের ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ যদি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হয়, তাহলে কেন হয়নি—তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কমিটির আহ্বায়ক বদলির পর তদন্তের ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা হয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, শাহিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি তার সম্পদের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, ভূমি ও প্লটের নথি, লিজ দলিল, নথি মুভমেন্ট রেজিস্টার এবং নিয়োগসংক্রান্ত ব্যক্তিগত নথি পরীক্ষা করা হোক। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তদেরও দায়মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু তদন্ত ঝুলিয়ে রেখে বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য চাপা রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল শাহিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিত বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি।
গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দমদমা ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি দুই বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতায় এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে মিলছে না প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, হচ্ছে না জনবল নিয়োগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালটি চালু হলে শ্রীপুরসহ আশপাশের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ সহজে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা পেতেন। কিন্তু প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা এসে চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের ভবন, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জামও। জানা গেছে, গর্ভবতী মা, প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যেই ইউনিয়ন পর্যায়ে এই ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দমদমা গ্রামে স্থানীয়দের দান করা ৪৩ শতাংশ জমির ওপর ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হ্যাভেন এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স রুপালী এন্টারপ্রাইজ হাসপাতালটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। হাসপাতালটিতে রোগীর শয্যা, জেনারেটর, এসি, ফ্যান, চেয়ার-টেবিলসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়েছে। তবে ভবন প্রস্তুত হলেও চিকিৎসক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেবা কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছাত্তার বলেন, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য গ্রামের কয়েকজন মিলে জমি দান করেছেন। আধুনিক ভবন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলেও এখন পর্যন্ত চিকিৎসক বা সেবার সুযোগ পাননি তারা। চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে যেতে হওয়ায় সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। আরেক বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, হাসপাতালটি চালু হলে সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ সহজেই চিকিৎসাসেবা পেতেন। সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরও শুধু অনুমতির কারণে এটি চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দমদমা, নলগাঁও, চিনাশুকানিয়া, দরপাড়াসহ আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালটির ওপর নির্ভর করে আছেন। দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। হাসপাতালের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সহকারী নার্সিং অ্যাটেন্ডেন্ট জোবাইদা আক্তার রিমা জানান, তিনি ডেপুটেশনে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বড় একটি হাসপাতালে একা দায়িত্ব পালন করাও নিরাপদ মনে করছেন না বলে জানান তিনি। গাজীপুরের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন জানান, হাসপাতালটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের জুনে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কমিটির মাধ্যমে হাসপাতালটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু তাহের মো. সানাউল্লাহ নুরী বলেন, প্রশাসনিক অনুমতি না থাকায় হাসপাতালটি চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই হাসপাতালটির কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অন্যদিকে, স্থানীয়দের প্রশ্ন—কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতাল যদি রোগীর সেবায়ই না আসে, তাহলে এতদিন ধরে পড়ে থাকবে কেন? দ্রুত অনুমোদন, জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে হাসপাতালটি চালুর দাবি তাদের।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সচল যন্ত্রপাতি বিকল দেখিয়ে মেরামতের নামে লোপাট করা হয়েছে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা। এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও এক স্টোরকিপারের নাম সামনে এসেছে। অথচ হাসপাতালটিতে অচল পড়ে আছে ১০০ কোটি টাকার তিন শতাধিক জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র। রাজধানীসহ সারা দেশের লাখ লাখ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসা নেয় এই হাসপাতালে। অথচ ৩২০টি অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র বছরের পর বছর ধরে বিকল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। এর মধ্যেই সচল যন্ত্র নষ্ট দেখিয়ে অর্থ লোপাটের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাঁ থেকে সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা এবং স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলাম। এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা এবং স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। নষ্ট না হওয়া যন্ত্র মেরামত হলো যেভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যন্ত্র মেরামতের বরাদ্দ ছিল ৪০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খরচ দেখানো হয় ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা।২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ দেখানো হয় ১৫ লাখ ২১ হাজার টাকা। পেশেন্ট মনিটর, ইসিজি মেশিন, ওটি টেবিল ও ডায়াথার্মি মেশিন মেরামতের নামে সাতটি কোটেশনের মাধ্যমে তোলা হয় এই অর্থ। দুই অর্থবছর মিলিয়ে মেরামতের নামে মোট তোলা হয়েছে ৪৭ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটি বিলে তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও এতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো সম্মতি ছিল না বলে জানা গেছে। বিষয়টি জানতে পেরে বিস্ময় প্রকাশ করেন হাসপাতালের প্রধান বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান। তিনি বলেন, ‘এসব যন্ত্র তো নষ্টই হয়নি, মেরামত হবে কীভাবে? নষ্ট হলে সবার আগে আমাদের বায়োমেডিকেল টিমের জানার কথা। আমরা কিছুই জানি না, অথচ কাগজপত্রে নাকি মেরামত সম্পন্ন করে বিলও তোলা শেষ! পুরোটাই ভুয়া কোটেশন বানিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।’ মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান বলেন, ‘বিষয়টি সম্প্রতি জানতে পেরেছি। এটি নিয়ে তৎকালীন পরিচালক শফিউর রহমানের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিও এসেছে। তিনি কয়েক দিন পরপর মীমাংসার জন্য হাসপাতালে আসেন। এই টাকা স্টোরকিপার রফিক ও পরিচালক সিন্ডিকেটের পেটে গেছে।’ কাজ পায় স্টোরকিপারের স্ত্রীর ভুয়া প্রতিষ্ঠান হাসপাতালের বিভিন্ন মেরামত ও মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ‘এম/এস এস.আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। দরপত্রে ঠিকানা দেখানো হয় মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩১৪-৩১৫ নম্বর বাসা (ফ্ল্যাট ৪/বি)। তবে দরপত্রে উল্লিখিত ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দরপত্রে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেখানো হয় রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার এই ভবনে। তবে সেখানে গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ওই ভবনের বাসিন্দা ও স্থানীয়রা জানান, ভবনটির পুরোটাই আবাসিক। সেখানে কোনো অফিস বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল হাসপাতালের স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রীর নামে খোলা একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান। সরকারি চাকরিতে থেকে স্ত্রীর নামে কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান খুলে জালিয়াতির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘স্ত্রী স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেন।’ বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের স্বাক্ষর ছাড়া এবং মালামাল না বুঝে পেয়ে কীভাবে বিল পাস হলো? এমন প্রশ্ন করা হলে নামাজের অজুহাতে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান তিনি। ভালো যন্ত্র নষ্ট দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করা হয়েছিল। সেই টাকা সমন্বয়ের জন্য পরিচালকের নির্দেশে বিল করা হয়েছে।’ অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত গ্লাভস ফের ওটিতে অনুসন্ধানে উঠে আসে, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল প্রসিডিউর গ্লাভস নতুন করে প্যাকেটজাত করে হাসপাতালের স্টোরে সরবরাহ করতেন স্টোরকিপার রফিক। জালিয়াতি চাপা দিতে নার্সদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, ব্যবহৃত গ্লাভস যেন কেটে ফেলা না হয়। হাসপাতালটিতে বছরে অন্তত ১০ হাজার জোড়া সার্জিক্যাল প্রসিডিউর গ্লাভসের প্রয়োজন হয়। প্রতি জোড়ার দাম অন্তত ১৫০ টাকা। সে হিসাবে বছরে শুধু গ্লাভসের পেছনেই খরচ হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংক্রমিত গ্লাভস পুনরায় ওটিতে ব্যবহার করা রোগীর জীবন নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ধরনের গ্লাভস সরবরাহ করা হয়েছে। পরে চিকিৎসকদের আপত্তির মুখে গত বছর থেকে উন্নতমানের গ্লাভস সরবরাহ শুরু হয়। এদিকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হলেও স্টোরকিপার রফিকের রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও চালক। ১৯৯২ সালে যোগদান করা রফিক চাকরির সুবাদে আগারগাঁওয়ে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার (বি-১৪, জি-১০) বরাদ্দ পেলেও বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ১৭ বছর ধরে নিজে না থেকে অন্যকে ভাড়া দিয়ে আদায় করেছেন ৮১ লাখ টাকার বেশি। রফিকের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখনও বিকল তিন শতাধিক যন্ত্র একদিকে সচল যন্ত্রের ভুয়া মেরামত দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা লোপাট হচ্ছে। অন্যদিকে অতি জরুরি তিন শতাধিক ছোট-বড় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম বছরের পর বছর ধরে বিকল পড়ে আছে।২০২২ সালে হাসপাতাল থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার অক্সিজেন পাইপলাইন চুরির ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়নি। ফলে এর সঙ্গে জড়িতদের কারও গায়েও আঁচড় লাগেনি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্টোরকিপার রফিক বলেন, ‘এই চুরি সম্পর্কে ওয়ার্ড মাস্টাররা জানে, আমি কিছু জানি না।’ নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকায় রয়েছে ভেন্টিলেটর, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্সরে, এন্ডোস্কপি, কলোনস্কোপি, পেশেন্ট মনিটর, আল্ট্রাসাউন্ড, অক্সিজেন জেনারেটরের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী নানা সরঞ্জাম। এগুলোর মোট মূল্য অন্তত ১০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ১৮ কোটি টাকায় কেনা একমাত্র এমআরআই যন্ত্রটি বছর দু-এক যেতেই বিকল হয়ে পড়ে। পরে সেটি আর ঠিক করা হয়নি। ফলে প্রতি মাসে শত শত রোগী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুটি সিটি স্ক্যানের মধ্যে একটি নষ্ট পড়ে আছে পাঁচ বছর ধরে। চার কোটি টাকায় কেনা এই যন্ত্রটি সচল করার কোনো উদ্যোগ নেই। এ ছাড়া ৪০টি ভেন্টিলেটর পড়ে আছে। এগুলোর একেকটির দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সে হিসাবে শুধু ভেন্টিলেটরই পড়ে আছে ১২ কোটি টাকার। পূর্ণাঙ্গ সেটআপসহ দুটি পোর্টেবল এক্সরে মেশিন পড়ে আছে, যার দাম ৬ কোটি টাকা। এন্ডোস্কপি ও কোলনোস্কোপি পড়ে আছে সাতটি। এগুলোর প্রতিটির দাম অন্তত এক কোটি টাকা হিসাবে সবকটির মোট দাম কমপক্ষে সাত কোটি টাকা। দেড় কোটি টাকা মূল্যের পেশেন্ট মনিটর পড়ে আছে ৩০টির বেশি। ৭ কোটি ২ লাখ টাকার আল্ট্রাসাউন্ড পড়ে আছে ১৪টি, ৮০ লাখ টাকার দুটি ইকো মেশিন, এক কোটি টাকার একটি এক্সরে ম্যামোগ্রাফি, চার কোটি টাকার দুটি অক্সিজেন ও দুটি এয়ার জেনারেটর পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়। বিকলের তালিকায় আছে ল্যাপারোস্কোপিও, যার প্রতিটির মূল্য অন্তত ৮০ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে ১০টি ল্যাপারোস্কোপির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে হাসপাতালটিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্র অচল অবস্থায় পড়ে আছে। সিন্ডিকেটের পকেটে রাজস্বের কোটি টাকা রোগ নির্ণয় ফি, ওষুধ বিক্রি, বেড ভাড়াসহ হাসপাতালের বিভিন্ন খাত থেকে আসা রাজস্ব আয়ে স্বচ্ছতা আনতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে অটোমেশন চালু করেন সম্প্রতি পরিচালক থেকে ওএসডি হওয়া ডা. সেহাব উদ্দিন। এতে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দুই কোটি টাকা বেশি আয় হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, রাজস্ব আয়ের এই তহবিল আগে যেত কোথায়। অটোমেশনের আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালের রাজস্ব আয় ছিল পাঁচ কোটি ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৫ টাকা। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (২৬ জুন পর্যন্ত) আয় হয়েছে ছয় কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ১৫০ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধান ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭৫ টাকা। একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, এই পুরো টাকা গেছে নন্দ দুলাল ও রফিকের পেটে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর হাসপাতালে পরিচালক পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে থেকে যান উপপরিচালক নন্দ দুলাল সাহা। তিনি ও স্টোরকিপার রফিক প্রতিষ্ঠানের সব কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত। সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা প্রথমে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে বলেন। পরে টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে।’ অভিযোগের বিষয়ে সাবেক পরিচালক ডা. শফিউর রহমান বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো কথা হবে না। ওখানে দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে। সরকারের আরও দেখার অনেক বিভাগ আছে, তারা সবাই দেখছে। আমার শাসনামলে কোনো কাগজপত্রে কোথাও কোনো গরমিল নেই।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হলো, একটা মেশিন নষ্ট হলে ডিপার্টমেন্ট থেকে রিকুইজিশন দেয়। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা যাচাই-বাছাই করে কোটেশনের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি কেনে। যার মেশিন ঠিক হয়েছে, ব্যবহারকারীরা সঠিক বললে তবেই বিল স্টোর অ্যাকাউন্টস হয়ে আমার কাছে আসে। এখানে দুই নম্বরি করার সুযোগ নেই। তৌহিদ এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে দলাদলি থাকার কারণে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে পরিচালকের পেছনে লাগে। এটা (ভুল তথ্য দিয়ে বিল তোলা) সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, ‘বিষয়টি আমলে নেওয়া হলো। সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠান খুলে একই প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারির সুযোগ নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কমিটি দিয়ে তদন্ত করা হবে। তাতেও না হলে অধিদপ্তর করবে। সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমার সময়ের না, তবে তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি নিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)। জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন ও ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়েছে এডিসি। প্রকল্পে নিম্নমানের পণ্য, অসম্পূর্ণ কাজ, দ্বৈত বিল, অনুমোদনহীন ব্যয় এবং বাধ্যতামূলক পরীক্ষা এড়িয়ে এই বাড়তি অর্থ নেয় ঠিকাদার। টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এই প্রকল্পে মোট ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির যেই তথ্য উঠে এসেছে, তার মধ্যেই বাড়তি নেওয়া এই অর্থ রয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেভির সহায়তায় লুটপাটের এই পথ তৈরি করে দিয়েছিল জাইকা। মূলত ঋণদাতা, ঠিকাদার ও পরামর্শক একই দেশের হওয়ায় প্রকল্পটি থেকে অর্থ সরানো সহজ হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চারের সদস্য হচ্ছে জাপানি নিপ্পন কোয়েই ও ওসি গ্লোবাল, সিঙ্গাপুরের সিপিজি এবং বাংলাদেশের ডিডিসি লিমিটেড। অনুসন্ধানের প্রথম ধাপে প্রায় ছয় হাজার ও দ্বিতীয় ধাপে আরও এক হাজার পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র, বিল, আদেশ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, চিঠি, ঋণ ও প্রকল্পসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুটি দাবিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিয়মের মাধ্যমে ৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বাড়তি নিয়েছে। আর প্রকল্পের বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ ও বিভিন্ন বিলবাবদ এডিসির কাছে বেবিচকের দাবি ১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচনসহ প্রযুক্তিগত শর্ত নির্ধারণে জাইকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। জাপানের এই সরকারি সংস্থাটি আন্তর্জাতিক পরামর্শকের সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়েছিল যেখান থেকে এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে বেছে নেয় বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রকল্পের প্রযুক্তিগত শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে জাপানি ঠিকাদারই কাজ পায়। এমনকি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডিসি যখন বেশি বেশি বিল নিচ্ছিল, তখন এডিসির বাড়তি দাবি মেটাতে আরও ঋণ দিতে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছিল জাইকা। অর্থাৎ, একদিকে জাপান ঋণ দেবে, অন্যদিকে জাপানি প্রতিষ্ঠানই সেই টাকা নিয়ে যাবে, মাঝ দিয়ে দায় চাপবে বাংলাদেশের জনগণের ওপর–এমন কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়েছে এখানে। ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে জাইকা তিন দফায় ১৬ হাজার ১২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আর ঠিকাদারের বিলের পরিমাণ ঋণের প্রায় সমান। মোট ব্যয়ের বাকি অর্থের প্রায় পুরোটা গেছে পরামর্শকের বিল এবং ভ্যাট, ট্যাক্স ও শুল্ক পরিশোধে। এই প্রকল্পের অর্থদাতা, পরামর্শক ও ঠিকাদার একই দেশের হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। প্রকল্পটিতে ‘মেগা দুর্নীতি হয়েছে’ উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এই দুর্নীতির দায় জাইকা এড়াতে পারে না। জাইকাসহ প্রকল্পে যুক্ত সব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে অর্থ উদ্ধার করতে হবে।’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বেবিচকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, ‘জাপানি ঋণের শর্তে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা হয়েছিল, অথচ সেগুলো বাংলাদেশের প্রয়োজন ও পরিবেশের উপযোগী ছিল কি না–তা যাচাই বা কার্যকরভাবে দরকষাকষি করার সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের ছিল না। শুরুতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসব প্রযুক্তির পক্ষে সাফাই গাইলেও পরে তারাই জানায়, এর কিছু অংশ বাংলাদেশে কার্যকর নয়।’ ‘পরে এই টার্মিনালের অপারেশনের কাজটিও জাপানি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল জাইকা,’ টাইমসকে বলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বেবিচকসহ প্রকল্পে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গ সকলেই লুটপাটে সহযোগিতা করে। ফলে মোহাম্মদ মফিদুর রহমান নিজেও তার দায় এড়াতে পারেন না। যেভাবে অর্থ লুট নথি বলছে, পরিবর্তন আদেশ ও প্রাইস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সব থেকে বেশি বাড়তি অর্থ নিয়েছে ঠিকাদার। বাধ্যতামূলক অনুমোদনগুলো পাস কাটিয়ে এডিসিকে ৩ হাজার ১২ কোটি টাকা দিয়েছে বেবিচক যাতে সহায়তা করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়। পণ্যের ব্র্যান্ড ও উৎপাদনকারী দেশ বদলে দিয়ে ঠিকাদার ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বেশি নিয়েছে। কমদামি ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করেও চু্ক্তিমূল্য অনুযায়ী বিল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাটির কাজে ২২৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে ঠিকাদার। একই সড়কের জন্য দুই খাত থেকে দুবার বিল নেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে বেবিচকের নথিতে। যে কাজ সম্পন্ন হয়নি, তারও বিল নিয়েছে। বাধ্যতামূলক ট্রায়াল (ওআরএটি) না করেই এডিসি নিয়েছে ৪৩২ কোটি টাকা। এরপরও এই খাতে নতুন বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে সরকার। এদিকে, পরীক্ষা ও সনদ ছাড়াই বড় অঙ্কের বিল নিয়েছে ঠিকাদার। নথিতে স্টেইনলেস স্টিলের বদলে মাইল্ড স্টিল, ডাকটাইল আয়রন ও কমদামি বিকল্প ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। নাট-বল্টু ও যন্ত্রাংশে মরিচা ও ক্ষয় পেয়েছে বেবিচক। বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে জরুরি রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা চালু করতে পারেনি ঠিকাদার। আপসে সরকার এমন বেপরোয়া লুটপাটের পরও অর্থ উদ্ধারের বদলে ঠিকাদারের সঙ্গে আপসের পথে গেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ৬ মে আপস-মীমাংসা কমিটির দেওয়া রায় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেবিচকের দাবি করা অর্থের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার দাবি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তামাদি হয়ে গিয়েছিল। এর আগে দুটি রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষায় প্রকল্পে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম উদঘাটিত হওয়ার পড়ে ঠিকাদারের কাছে বাড়তি অর্থ ফেরত দাবি করে বেবিচক। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ে দায়িত্বে থাকা বেবিচক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান সময়মতো দাবি উত্থাপন না করাকে একটি ‘অনিয়ম’হিসেবে স্বীকার করেছেন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার স্বার্থে ঠিকাদারের সঙ্গে বিরোধে জড়ায়নি বেবিচক। কারণ, জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে খুবই গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ সরকার।’ নথি বলছে, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের ভৌত কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে নানা অনিয়ম ও জটিলতায় এবং পরবর্তী কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় গত দুই বছরের বেশি সময়েও বাকি ২ শতাংশ কাজ শেষ করে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হয়নি। মন্তব্য জানতে বেবিচক চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের সঙ্গে তিন দফায় যোগাযোগ হলেও ব্যবস্ততার কারণ দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছেন। এদিকে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেভি লিখিতভাবে টাইমসকে জানিয়েছে, গোপনীয়তার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তারা দিতে পারবে না। প্রকল্পের অনিয়ম সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জাইকা ও এডিসি।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। শুনানিতে তিনি বলেন, এ মামলায় পরোয়ানা মূলে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন পর্যন্ত আসামিপক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি। অতএব তাকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করছি। শুনানি শেষে আবেদনটি মঞ্জুর করে লতিফ সিদ্দিকীকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এ সময় প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, তারেক আবদুল্লাহসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া, লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কাদের সিদ্দিকীসহ অন্যান্য আইনজীবী। এদিন দুপুর ১টার পর ডিবি পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে করে লতিফ সিদ্দিকীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। প্রসিকিউশন জানায়, শাপলা চত্বরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে, ২৭ জুলাই এ মামলায় প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ১০ জনকে হাজিরের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন আটজন। তারা হলেন- সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু। অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এছাড়া আবদুর রাজ্জাকও গ্রেপ্তার আছেন। বাকিরা পলাতক। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত শাপলা চত্বরে আবু বকর সিদ্দিকসহ ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছাদেক মিয়াসহ ২০ জনকে হত্যা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে হওয়া নিহতের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া রাশেদুল ইসলাম, আবু ইউসুফসহ বহু মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও নির্যাতনের মাধ্যমে গুরুতর আহত করা হয়। এসব ঘটনা গণহত্যা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।
১১ জনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে সুপারেন্টেন্ড ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতির জন্য জোর তদবির করছেন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাদের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কোন প্রমান নেই তাদেরকে বিধিমতে কোনোভাবেই পঞ্চম গ্রেডের উপরে পদোন্নতি দেবার সুযোগ নেই। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বঙ্গভবনের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালে সংসদ ভবনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে তাকে সরিয়ে সমীরণ মিস্ত্রিকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়। যখনি কোন ওয়ার্কিং ডিভিশনে দায়িত্ব পেয়েছেন তখনি শুরু করেছেন লুটপাট। এমনকি পিএন্ডডিতে থাকাকালীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গণপূর্তের শিডিউলভুক্ত করতে নিয়েছেন বিপুল অংকের অর্থ। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী আশরাফুল হক দুই ছেলেকে কানাডা পাঠিয়ে নিয়মিত ডলার পাচার করছেন বলে অভিযোগ আছে। টেন্ডার প্রতি ২% টাকা গ্রহণ , টেন্ডারে ভুল ধরে ৫% পর্যন্ত টাকা নিয়ে অবৈধভাবে ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেবার মাস্টারমাইন্ড এই আশরাফুল হক। গভীর জলের মাছ আশরাফুল হক শেখ মুজিবের সমাধির সকল বৈদ্যুতিক কাজের পরিকল্পনা করে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতে। ডিপার্টমেন্টে তার বিরুদ্ধে অনেকেরই গুরুতর অভিযোগ থাকলেও কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পায় না। এসব বিষয়ে কথা বলতে আশরাফুল হক এর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তা সম্ভব হয়নি। তার ঘুস, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের তথ্য নিয়ে বিস্তারি আসছে দ্বিতীয় পর্বে..
নিজস্ব প্রতিবেদক প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকার অভিজাত গুলশানকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক শফিউল্লাহ আল মুনির-কে ঘিরে একাধিক মামলা, অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের আদেশ এবং আর্থিক অনিয়মের বিবরণ মিলিয়ে একটি বিস্তৃত ও জটিল চিত্র সামনে এসেছে। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ, চাকরি ও লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি অতীতের অপরাধ সংশ্লিষ্ট ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। শফিউল্লাহ আল মুনির বতর্মান পুলিশের আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরের নাম বিক্রি করে চলে। সে যেখানে যায় সেখানেই বলে আমি আইজিপির লোক। অথচ দৈনিক বাংলার আলো নিউজ পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায় আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরের সাথে তার কোন যোগাযোগই নেই। ২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় র্যাব অভিযান চালিয়ে শফিউল্লাহ আল মুনিরকে আটক করে। অভিযানে ৪২/১/খা, বাকাউল অ্যাপার্টমেন্টের ৩য় ও ৪র্থ তলায় পরিচালিত স্টুডিও থেকে পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট সামগ্রী উদ্ধার করা হয় বলে জানানো হয়। র্যাবের তথ্যমতে, সেখানে ৯টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৫ পুরিয়া গাঁজা এবং একাধিক পর্নো সিডি পাওয়া যায়। ওই সময় তার সঙ্গে টনু, তানভীরসহ সহযোগী এবং চারজন কথিত মডেলকেও আটক করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ তৈরি করেন। তবে একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ জমা হতে থাকে। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক জনাব তাপস ভট্টাচার্য একটি আবেদন করেন, যার ভিত্তিতে আদালত শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই আবেদনের ভিত্তি ছিল দুদকের নথি নং-০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.০৪১.২৪-৫০২৫৫(২), তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) এর ই/আর নং-১৬৯/২৪, তারিখ ৩ নভেম্বর ২০২৪। আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশত্যাগ করলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে জনস্বার্থে তার বিদেশ যাওয়া বন্ধ রাখা প্রয়োজন। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে তার সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। অনুসন্ধান অনুযায়ী তার নামে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ১২৫ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ১০ কোটি ৯৫ লাখ ১১ হাজার ৬৪৯ টাকার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। অথচ তার ঘোষিত বৈধ আয় মাত্র ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭৬ টাকা। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ডিএমপি’র মিরপুর মডেল থানার এফআইআর নং-২০/২৩৩, তারিখ ১১ মে ২০২১ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় ধারা ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড-১৮৬০ অনুযায়ী অভিযোগ করা হয়, তিনি কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬,০০,০০০ টাকা ধার নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন। মামলার জি আর নং, তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। তবে তদন্তে দেখা যায়, বাদী নিজেই দাবি করেন যে তিনি এই মামলা করেননি এবং এজাহারের তথ্য ভুয়া। তদন্ত শেষে ২৮ অক্টোবর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট (তথ্যগত ভুল) দাখিল করা হয় এবং অভিযুক্তকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। কাফরুল থানার এফআইআর নং-৬/৯৪, তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২১, ধারা ৪২০/৪০৬/৫০৬ মামলায়ও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, যেখানে পরবর্তীতে ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৭২ দাখিল করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শেরেবাংলা নগর থানার এফআইআর নং-৪৩/১৫১, তারিখ ২৪ মার্চ ২০২১ মামলায়ও ৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৪৬ দাখিল করে অভিযোগ মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে বনানী থানার এফআইআর নং-৩৯/২৩৯, তারিখ ২৭ আগস্ট ২০২০ মামলায় চার্জশিট নং-২৫৪, তারিখ ২ নভেম্বর ২০২০-এ তাকে অভিযুক্ত করা হয়। গুলশান থানার এফআইআর নং-২৪, তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ মামলায় চার্জশিট নং-২৭৬, তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৩-এ অভিযোগ গঠন করা হয়। এছাড়া গুলশান থানার এফআইআর নং-৪/২৮৯, তারিখ ২ অক্টোবর ২০২১ এবং এফআইআর নং-৪৭/৩৩২, তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২১ মামলাগুলোতেও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে যথাক্রমে ৩১ মে ২০২২ তারিখে। মামলার বাইরে অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। ব্যবসায়িক অংশীদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরেফিন সোহেল শিবলীর কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা, জাহাঙ্গীর সাহেবের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। রংধনু গ্রুপের এমডি অপু সাহেবের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দুদকে তদবিরের নামে। বিদেশে পাঠানোর নামে সুধাংশু বাবুর কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা, এলপিজি ডিলার দেওয়ার নামে আখি রানীর কাছ থেকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, পাটোয়ারী ট্রাভেলসের মালিকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে—মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে ৬ লাখ টাকা, ফায়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার নামে ৫ লাখ ও ২২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগও উল্লেখযোগ্য। খাগড়াছড়িতে ইপিজেড প্রকল্প, ক্যাবল কার প্রকল্প, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প, নদীতে সাব-জেটি নির্মাণ—এসব প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জমি ক্রয়, অফিস ব্যয়, স্টাফ বেতন, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের বিবরণও রয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত খরচের ক্ষেত্রেও অন্যের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—গুলশান অফিসের ভাড়া, ১৮ মাসের স্টাফ বেতন, ইফতার পার্টি, শীতবস্ত্র বিতরণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাজারের ওরশ ইত্যাদি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সৌদি আরব, দুবাই এবং ইংল্যান্ডে একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন এবং এসব ভ্রমণের খরচ অন্যের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে বহন করেছেন। তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো, টাকা চাইলে হুমকি দেওয়া—এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি ঘটনায় উল্লেখ করা হয়, জামিনের প্রয়োজনে একটি রোলেক্স ঘড়ি জামানত হিসেবে দিয়ে ৭০ লাখ টাকা নেওয়ার পর তা ফেরত না দিয়ে উল্টো দাবি করা হয় যে ঘড়িটি জামানত ছিল না। এছাড়া জমি ক্রয়ের নামে ৬৬ লাখ টাকার চেক দেওয়া হলেও তা ব্যাংকে ডিজঅনার হয়। গুলশানের একটি বাসার ভাড়া বাবদ ২৫ লাখ টাকা বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে দেখা যায়, শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত অভিযোগের চিত্র। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে একাধিক মামলায় চার্জশিট দাখিল এবং দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এই সমগ্র পরিস্থিতি বিচার করে বলা যায়, অভিযোগ, মামলা, তদন্ত এবং আদালতের আদেশ—সব মিলিয়ে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনো বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আদালত ও তদন্ত সংস্থার ওপর।
কক্সবাজারের রামুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো একটি প্রাইভেটকারে ইয়াবা পাচারের সময় তিন সদস্যের একটি চক্রকে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার পিস ইয়াবা, একটি প্রাইভেটকার এবং চারটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রামু উপজেলার রামু রাবার বাগান এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মন্ডল। আটককৃতরা হলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শালুকিয়া এলাকার সাব্বির হোসেন (৩৬), নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাউ এলাকার সিমা ইসলাম (২২) এবং ঢাকার দারুসসালাম থানার দক্ষিণ বিশিল এলাকার উর্মি আক্তার উষা (১৮)।. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো একটি সাদা রঙের টয়োটা সিএইচআর প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় স্কচটেপ ও টিস্যু পেপার দিয়ে মোড়ানো তিনটি পোটলা থেকে মোট ৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অভিযানে ইয়াবা বহনে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়। এছাড়া আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে চারটি স্মার্টফোন, গাড়ির ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন জব্দ করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মন্ডল জানান, আটক তিনজনের বিরুদ্ধে পরিদর্শক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বাদী হয়ে রামু থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে মাদক পাচারের এ কৌশল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না এবং ব্যবহৃত স্টিকারটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের ঢেউটিন ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে পিপিআর লঙ্ঘনের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে বিএমটিএফ (বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি) নিজেরা উৎপাদিত ঢেউটিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে সরবরাহ করবে। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কার্যাদেশ নিয়েছে বিএমটিএফ। কিন্তু আদতে তা তারা উৎপাদন করেনি। টিকে গ্রুপ থেকে ঢেউটিন কিনে এনে তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে সরবরাহ করেছে। এতে পিপিআর লঙ্ঘন করা হয়েছে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির কারণে দর প্রতিযোগিতার কোনো সুযোগ ছিল না। টেউটিনের দাম ধরা হয়েছে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি সরকারের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ভ্যাটও ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এসব অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ঢেউটিন খাতে বরাদ্দ ছিল ৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্য থেকে সর্বশেষ ৩৪ কোটি ৯ লাখ ২৬ হাজার ৮শ’ টাকার ঢেউটিন কেনা হয়। পাঁচটি প্যাকেজের টেন্ডার আইডি-তে ঢেউটিনগুলো কেনা হয়। পিপিআর অনুযায়ী, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নিজেরা পণ্য উৎপাদন করে সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য কেনা যাবে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড নিজেরা ঢেউটিন উৎপাদন করে এবং নিজেদের উৎপাদিত ঢেউটিন তারা সরবরাহ করবে- এ অঙ্গীকারনামায় প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে। ঢেউটিনগুলোর ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি মেট্রিক টন ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮শ’ টাকা করে। বাজারদরের চেয়ে এই মূল্য অনেক বেশি, জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট। বাজারে সর্বোচ্চ মানের ঢেউটিন প্রতি মেট্রিক টন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। ত্রাণের ঢেউটিন কখনোই ভালো মানের কেনা হয় না, এটা সবারই জানা কথা। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সরবরাহ করা এই ঢেউটিনগুলোও সরেজমিন পরিদর্শনে নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তেজগাঁও সিএসডিস্থ কেন্দ্রীয় ত্রাণ গুদাম পরিদর্শনে আরও ভয়াবহ রকমের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তা হলো, প্রত্যেকটি ঢেউটিনের গায়ে ‘টিকে’ কোম্পানির সিল রয়েছে। অর্থাৎ ‘টিকে’ কোম্পানির উৎপাদিত ঢেউটিন এগুলো। বিএমটিএফ নিজেরা উৎপাদন করেনি বা নিজেদের উৎপাদিত ঢেউটিন সরবরাহ করেনি। অবাক ব্যাপার হলো, ঢেউটিন সরবরাহের কাজে এ রকমের জাল-জালিয়াতি তো করা হয়েছেই, এমনকি নিজেদের উৎপাদিত পণ্য- একথা দাবি করে সরকারের ভ্যাটও ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সরকারকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার কথা। কিন্তু বিএমটিএফ (বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি) নিজেদের উৎপাদিত পণ্য- দাবি করে ১০ শতাংশ ছাড় পেয়েছে। পরিশোধ করেছে মাত্র ৫ শতাংশ ভ্যাট। মোট ৩৪ কোটি ৯ লাখ ২৬ হাজার ৮শ’ টাকার ভ্যাট ১০ শতাংশের হারে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিএমটিএফ’র এমন কর্মকাণ্ডকে অনৈতিক ও বড় ধরনের অনিয়ম বলে আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন। বিএমটিএফ যে নিজেদের উৎপাদিত ঢেউটিন সরবরাহ করছে না, একথা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের শীর্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সবাই জানেন। জেনে বুঝেই তারা এমন অপকর্মে সহযোগিতা করেছেন।
নওগাঁ থেকে (স্টাফ রিপোর্টার) মোঃ আকতার হোসেন। নওগাঁর পোরশা নিতপুর সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট সহ ২ চোরাকারবারীকে আটক করেছে নওগাঁ ব্যাটালিয়ন (১৬ বিজিবি)। মঙ্গলবার ০৭ জুলাই ২৬ বিকেলে নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুর ইউনিয়নের দিয়াড়াপাড়া নামক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন উপজেলার নিতপুর মাস্টার পাড়া গ্রামের মোঃ কালুর ছেলে মোঃ নয়ন (৪০) এবং একই গ্রামের মোঃ হানিফের ছেলে মোঃ আনারুল (৩২)। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেল আনুমানিক ৪:৫০ ঘটিকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিতপুর বিওপির টহল কমান্ডার নায়েব সুবেদার মোহাম্মাদ আলীর নেতৃত্বে বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল দিয়ারাপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে ৭ হাজার ৪৫০ পিস ভারতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ ২ চোরাকারবারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। নওগাঁ ব্যাটালিয়ন (১৬ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ আরিফুল ইসলাম মাসুম (পিএসসি) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আটককৃত আসামীদের বিরুদ্ধে পোরশা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্যসহ আসামীদের পোরশা থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তরের প্রস্তুতি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও জানান, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে অবৈধ সীমান্ত পারাপার, গবাদিপশু ও মাদক পাচারসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান রোধে বিজিবির এই সর্বাত্মক ও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ছাগলকাণ্ডের মতিউরের প্রায় দেড়শ কোটি টাকার সম্পত্তির তথ্য উঠে আসে। তবে অনুসন্ধানে মতিউরের চেয়েও সহিদুলের বেশি সম্পত্তির প্রমাণ মিলেছে। সহিদুলের শুধু ফ্ল্যাটের দামই আছে ১৬২ কোটি টাকা। প্লট, ফ্ল্যাট, দোকান ও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ যোগ করলে মোট সম্পদের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চাকরি করে ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাটসহ ৪০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ গড়েছেন তিনি। রয়েছে একাধিক আলিশান বাড়ি, অন্তত ২০টি প্লট ও দোকানপাট। সহিদুল ইসলাম নামের এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা বহুল আলোচিত ‘ছাগলকাণ্ডের’ মতিউর রহমানের সহকর্মী। বসুন্ধরা আবাসিকে শতকোটির ভবন রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ১০তলা একটি ভবন নির্মাণ করেছে সহিদুল দম্পতি। ভবনের নাম ‘শেল কবিতা’। বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছেন তারা। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে ফ্ল্যাট। ২০ ফ্ল্যাটের পুরো ভবনটিই তাদের। একাধিক ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম অন্তত পাঁচ কোটি টাকা। সেই হিসাবে শুধু ফ্ল্যাটের দামই কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। জমিসহ পুরো ভবনের বাজারমূল্য আরও অনেক বেশি। মিরপুর, বাংলামোটর, ইস্কাটনে ৩৩ ফ্ল্যাট বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সহিদুলের নিজের, স্ত্রীর ও আত্মীয়দের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। বাংলামোটর এলাকার স্বজন টাওয়ারে সহিদুলের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাট আছে। বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। এ ছাড়া মিরপুর রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি ছয়তলা ভবন রয়েছে। সেখানে ১০টি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে ফাহমিদার নামে চার কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট আছে। এই ভবনে বেশিরভাগ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা বসবাস করেন। মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ৭০ কোটির ভবন ও জমি মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রজেক্টে স্ত্রীর নামে আরেকটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন সহিদুল। ২০ ফ্ল্যাটের ওই ভবনের বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। পরে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে কাগজপত্রে ভবনের মালিক হিসেবে রয়েছেন কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান। সব মিলিয়ে সহিদুল, স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ও চার শ্যালকের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট এবং দুই দোকানের বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা। ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ছয়তলা বাড়ি এ ছাড়া ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগুন্দা ২১ মৌজায় (খতিয়ান ১৪৩ ও ১৪৪) ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশের দুটি প্লটে প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া। মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। মিরপুর বেড়িবাঁধের গড়ানচটবাড়ি মৌজায় (খতিয়ান ২৬৬৭) ৩৩ শতাংশ জমির দাম অন্তত ৩০ কোটি টাকা। নিউমার্কেট ও আজিজে দোকান রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১২৭ নম্বর দোকানটি সহিদুলের নামে। এটির বাজারমূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা। নিউমার্কেটের ২৬/২ নম্বর দোকানটিও তার। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, এটির দাম দুই কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, দুটি দোকানের মোট মূল্য চার কোটি টাকার ওপরে। মধুমতি মডেল টাউনে ১০ কোটির বাংলোবাড়ি শুধু রাজধানীতে নয়, ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন সহিদুল। মধুমতি মডেল টাউনে তার নামে একটি আলিশান বাংলোবাড়ি রয়েছে। বাড়িটির নাম ‘সেঁজুতি’। ৩৫ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা লাল ইটের এই ভবন নিয়ে স্থানীয়দের কৌতূহলের শেষ নেই। মধুমতি মডেল টাউনে ৩৫ কাঠার ওপর বাংলো বাড়ি। এলাকাবাসী জানান, মাঝেমাঝে কয়েকটি গাড়ি এসে থামে। তবে ভবনের কেয়ারটেকার বা অন্য কেউ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন না। এলাকার বাজারদর অনুযায়ী, এই বাংলোবাড়ির শুধু জমির দামই আছে অন্তত ১০ কোটি টাকা। মধুমতিতে আরও ৯০ কোটির জমি গাবতলী থেকে আমিনবাজার পেরিয়ে দুই কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে ৫৫০ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে মধুমতি মডেল টাউন। সবুজে ঘেরা এই প্রকল্পে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের বিনিয়োগ রয়েছে। বেশিরভাগই বাংলোবাড়ি। কোনো প্লট ভাড়া দেওয়া বাস-কাভার্ডভ্যানের ওয়ার্কশপ হিসেবে। রয়েছে গরু-ছাগলের একাধিক খামার। এই প্রকল্পে সহিদুলের মালিকানায় রয়েছে পাঁচটি প্লট। প্রকল্পের প্রধান ফটক পেরিয়ে বাঁ-দিকে প্রথম সড়কের দ্বিতীয় প্লটটি ২০ কাঠার। বর্তমানে গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া। মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। কয়েকশ গজ সামনে ব্রিজ লাগোয়া ১২০ কাঠার প্লটে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার। মূল্য ৩০ কোটি টাকা। ওই প্লটের পাশে ৬০ কাঠার আরেকটি প্লট এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতির গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া। মূল্য ১৫ কোটি টাকা। ব্রিজ পেরিয়ে ১০ কাঠার একটি প্লটের দাম তিন কোটি টাকার বেশি। প্রকল্পের শেষ প্রান্তে ডানদিকে ১১০ কাঠা জমির দাম কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। পাঁচটি প্লটে মোট জমি ৩২০ কাঠা। একসঙ্গে বাজারমূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা। পূর্বাচলে ৬২ কোটির ছয় প্লট পূর্বাচলে সহিদুল দম্পতির ছয়টি জমির কাগজপত্র পাওয়া গেছে। ডুমনি মৌজায় পিংক সিটিতে (খতিয়ান ১২০৪৬) ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। পূর্বাচল পাঁচ নম্বর সেক্টরের পিতলগঞ্জ মৌজায় (খতিয়ান ৪৪৬১) সাড়ে ১৬ শতাংশ জমির দাম ১৫ কোটি টাকার বেশি। দিঘলিয়া মৌজায় (খতিয়ান ২৬৩৩) ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য অন্তত দুই কোটি টাকা। বাড়িয়াছনি মৌজায় (খতিয়ান ৫২৭২) সাত শতাংশ জমির মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। স্ত্রী ফাহমিদার নামে পূর্বাচলের মুশুরীগ্রাম মৌজায় (খতিয়ান ৪৩৪৩) ১৭ শতাংশ জমির মূল্য দুই কোটি টাকার বেশি। কামতা মৌজায় (খতিয়ান ২১৫০) সাত শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। গাজীপুরের কালিগঞ্জে পাড়াবর্থা-৮০ মৌজায় (খতিয়ান ২৭) সহিদুলের নামে ১৫ শতাংশ জমির কাগজ হাতে এসেছে। এই জমির দাম কোটি টাকারও বেশি। শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি স্থাবর সম্পদের বাইরে অস্থাবর সম্পদেও সহিদুল দম্পতির বিনিয়োগ কম নয়। ফাহমিদা রাব্বির নামে শেয়ারবাজারে একটি বিও অ্যাকাউন্টে (শেষ পাঁচ সংখ্যা ৬৯৭৫৪) প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে (শেষ চার সংখ্যা ০৭২৯) তার নামে নগদ ৫৫ লাখ টাকা জমা আছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে। বাবার টাকায় ছেলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বামী-স্ত্রীর বিপুল সম্পদের পাশাপাশি ছেলে হাসিন ফারহানের নামেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করে দিয়েছেন সহিদুল। বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে অফিস খুলেছেন ফারহান। ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে ভেলোসিটি আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইন্টেরিয়র এবং ভেলোসিটি মার্কেটিং এজেন্সিসহ একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। এই অফিসের জন্য ফারহানকে সহিদুল অন্তত পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে। চাকরি জীবনে আয় কত? এমন পদে সরকারি চাকরি করে কত টাকায় আয় করা সম্ভব তা জানতে সহিদুলের সহকর্মী ছিলেন কিংবা কাস্টমস ক্যাডারের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা এমন কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের বর্ণনায়, চাকরি জীবনে সর্বসাকুল্যে বেতন বাবদ পান দেড় কোটি টাকার মতো। এর বাইরে স্কলারশিপ কিংবা বিদেশ সফর বাবদ আরো ১ কোটি টাকা। আর অবসরকালীন দেড় কোটি টাকা বা এরচেয়ে কিছু কমবেশি। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খরচ বাদ দিয়ে কোন ভাবে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় করা সম্ভব না। কিন্তু বাস্তবে সহিদুল ইসলাম দম্পতির যে সম্পত্তি তা এই হিসাবের অন্তত ১০০গুণ বেশি। কর্মজীবনে সহিদুল ইসলাম এনবিআরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকার (পশ্চিম) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের মতো দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এনবিআরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব পদে থাকাকালে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। একাধিক সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশনের তারিখেও এই তথ্যের সত্যতা মেলে। সহিদুলের বেশিরভাগ সম্পত্তি ২০১০ সালের পর অর্জিত। অথচ এমন একজন কর্মকর্তার পুরো চাকরিজীবনের আয় কত হতে পারে? একই গ্রেডের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য সুবিধাসহ রাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পাওয়া যায়। বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে সারা চাকরিজীবনের মোট আয় প্রায় তিন কোটি টাকা। নিজের ও পারিবারিক খরচ বাদ দিলে সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের পরিমাণ হতে পারে কমবেশি তিন কোটি টাকা। কিন্তু সহিদুলের ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ কোথা থেকে এলো, সেই প্রশ্নের জবাব মেলে না। কথা বলতে রাজি নন সহিদুল দম্পতি আয়ের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে একাধিকবার সহিদুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনটি মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন করা হলেও ধরেননি তিনি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে সিন করেও উত্তর দেননি। পরে স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ফোন ধরেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন করা মাত্রই তিনি ফোন কেটে দেন। বসুন্ধরার জি ব্লকে শেল কবিতা ভবনে সরাসরি গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি। অনুসন্ধানের তাগিদ টিআইবির ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই সম্পত্তির উৎস কী, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের অনুসন্ধান করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্র যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর একটি সরকারি টেন্ডার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডারের শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার সনদ দাখিলের পরও একটি যৌথ উদ্যোগ (JV) প্রতিষ্ঠানকে Non-Responsive ঘোষণা করে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে Notification of Award (NOA) জারি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। nationalvoicenewsbangla.com’র হাতে আসা লিগ্যাল নোটিশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, Baset Prokousholi Limited–Versatile Technology Ltd JV-এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাজ্জাদ হোসেন পলাশ গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে নোটিশ পাঠান। নোটিশে অভিযোগ করা হয়, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় প্রতিষ্ঠানটির জমা দেওয়া Similar Nature Work Experience, Completion Certificate এবং Scope of Work যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ টেন্ডার নথিতে একই প্রকল্পের নাম নয়, বরং Similar Nature, Complexity and Construction Technology-এর কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পূর্বে একটি অডিটোরিয়াম প্রকল্পে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। সেখানে ইন্টারনাল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস, স্টেজ লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, এলইডি ডিসপ্লে, এয়ার কন্ডিশনিং, অ্যাকোস্টিক ওয়ার্কসসহ একাধিক জটিল প্রযুক্তিগত কাজ সম্পন্ন করা হলেও সেই অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়নের সময় গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ। আইনগত নোটিশে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের মূল্যায়ন সরকারি ক্রয়বিধির স্বচ্ছতা, সমতা ও প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে Non-Responsive ঘোষণার কারণ লিখিতভাবে জানানো, অভিজ্ঞতার সনদ পুনর্মূল্যায়ন এবং NOA-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া নোটিশে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (BPPA) Review Panel এবং প্রয়োজনে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হবে। বক্তব্য চেয়ে চিঠি, তবুও নীরবতা:সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করে nationalvoicenewsbangla.com র পক্ষ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত বক্তব্য চাওয়া হয়। অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা বা প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য ০২ জুলাই ২০২৬, বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও তিনি কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দেননি। এমনকি অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেননি। উঠছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন:সরকারি টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট নথিতে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির বিষয় নয়; বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। এ কারণে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।nationalvoicenewsbangla.com বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী বা অন্য কোনো পক্ষ পরবর্তীতে এ বিষয়ে বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
নওগাঁ জেলা (স্টাফ রিপোর্টার) মোঃ আকতার হোসেন। নওগাঁর পোরশায় উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) সমমান পরীক্ষায় অন্যের হয়ে প্রক্সি পরীক্ষা দিতে এসে মূল পরীক্ষার্থীসহ ২ যুবককে আটক করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তাদের উভয়কেই ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং ১৭৫০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। শনিবার দুপুরে পোরশা সরকারি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। সাজাপ্রাপ্তরা হলেন— মূল পরীক্ষার্থী পোরশা থানার বারিন্দা গ্রামের মোঃ রেজাউল সরদারের ছেলে মোঃ জাহিদ হাসান (২১) এবং প্রক্সি পরীক্ষার্থী একই থানার দেওনাপাড়া গ্রামের সময় বর্মনের ছেলে বিপ্লব বর্মন (২০)। পুলিশ ও কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, আজ পোরশা সরকারি কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি (সমমান) পরীক্ষা চলাকালীন মূল পরীক্ষার্থী জাহিদ হাসানের পরিবর্তে প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেন বিপ্লব বর্মন। পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রে দায়িত্বরত শিক্ষকের কাছে বিপ্লবের আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়। পরে প্রবেশপত্রের ছবির সাথে পরীক্ষার্থীর চেহারার মিল না পাওয়ায় শিক্ষক বিষয়টি কেন্দ্রে কর্তব্যরত এক্সিকিউটিভ (নির্বাহী) ম্যাজিস্ট্রেট মোসাঃ নাবিলা ফেরদৌস কে অবহিত করেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে প্রথমে প্রক্সি পরীক্ষার্থী বিপ্লব বর্মনকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল পরীক্ষার্থী জাহিদ হাসানকেও পরীক্ষা কেন্দ্রে ডেকে এনে আটক করা হয়। আটকের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। আদালত (মামলা নং-৯৬, ৯৭; তারিখ: ০৪/০৭/২০২৬) পাবলিক পরীক্ষা সমূহ (অপরাধ) আইন ১৯৮০ এর ১৩ (৩-ক) ধারা মোতাবেক অপরাধ স্বীকার করায় উভয় আসামিকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং একই সাথে ১৭৫০ টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেন। একই সাথে তাদের পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পোরশা থানা অফিসার ইনচার্জ জিয়াউর রহমান জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত ২ আসামী আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদেরকে নওগাঁ কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছ।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন